সর্বশেষ

সাধারণ সিগারেটের চেয়েও বেশি ক্ষতিকারক ই-সিগারেট

ডেস্ক রিপোর্ট।।  অনেকদিন ধরেই সিগারেট ছাড়তে চেয়েছিলেন সুমন কিন্তু কোন ভাবেই সম্ভব হচ্ছিল না। এর মধ্যেই সুমনের ছোট বেলার বন্ধু সোহাগ ফ্রান্স থেকে দেশে এসেছেন। আসার সময় সুমনের জন্য ই-সিগারেট নিয়ে এসেছেন। সুমন সিগারেট ছাড়ার জন্য সেটা ব্যবহার করতে শুরু করে।

 

সোহেল রানা বাবার ছোট সন্তান বড় ভাই জীবন দেশের বাইরে থাকেন। ছোট ভাইর জন্মদিনে উপহার দিয়েছেন একটি ‘ভ্যাপ’। যার বর্তমান বাজার মূল্য ২৮০ ডলার। বাংলা অর্থে প্রায় ২০ হাজার টাকা। রাজধানী উত্তরা, ধানমন্ডি অথবা বসুন্ধরা সিটি মার্কেট থেকে ফ্লেবার কিনে সেই ভ্যাপ করে তাড়া।বর্তমান সময়ে রাজধানীর তরুণদের মাঝে বেশ জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে এই ভ্যাপিং বিষয়টি। কারণ এর থেকে অনেক ধোঁয়া এবং বিভিন্ন সুগন্ধের ফ্লেবার থাকে। যা সাধারণ মানুষদের আকর্ষণ করে তোলে। এই জিনিসটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহার করে রাজধানীর ইংলিশ মিডিয়াম স্কুল গুলোর ছাত্র ছাত্রীদের মধ্যে।এই ভ্যাপ তারা কেন ব্যবহার করছেন? এমন প্রশ্নের জবাবে ছাত্ররা বলেন, সিগারেট খেলে মুখ থেকে গন্ধ বের হয়। তাছাড়া সিগারেট মানুষের স্বাস্থ্যের জন্য খুবই খারাপ। কিন্তু ভ্যাপ মানুষের শরীরে কোন ক্ষতি করতে পারে না। পাশাপাশি শরীরের শক্তির কোন কমতি হয় না।সাধারণ সিগারেটের বিকল্প হিসেবে ‘ইলেকট্রনিক নিকোটিন ডেলিভারি সিস্টেম’ বা ‘ইলেকট্রনিক সিগারেট’ ব্যবহার করা হয়। সিগারেটের মতই দেখতে ফাইবার বা প্লাস্টিক দিয়ে তৈরি এই ব্যাটারিচালিত যন্ত্রগুলির মধ্যে একটি প্রকোষ্ঠ থাকে। তার মধ্যে ভরা থাকে বিশেষ ধরনের তরল মিশ্রণ। যন্ত্রটি গরম হয়ে ওই তরলের বাষ্পীভবন ঘটায় এবং ব্যবহারকারী সেই বাষ্প টেনে নেয় ফুসফুসে, যা ধূমপানের অনুভূতি দেয়। এই পদ্ধতিকে বলে ‘ভ্যাপিং’।অনেকেই মনে করেন বা বিজ্ঞাপনেও দেখানো হয় ই-সিগারেট ধূমপানের অভ্যাস ত্যাগ করতে সাহায্য করে। কিন্তু এখানেই দেখা দিয়েছে বিতর্ক। ক্যানসার বিশেষজ্ঞদের মতে, ই-সিগারেট ধূমপান ছাড়তে সাহায্য করে এর কোনও প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি বরং কোনও কোনও ক্ষেত্রে এর প্রভাব সাধারণ সিগারেটের চেয়েও ক্ষতিকারক বলে দাবি করছেন বিশেষজ্ঞরা।

 

পশ্চিমা বিশ্ব থেকে শুরু করে তৃতীয় বিশ্বে দেশগুলোতেও গত কয়েক বছর ধরে ইলেকট্রনিক সিগারেটের প্রচলন বেড়েছে কয়েকগুণ। কিন্তু এই জনপ্রিয়তার পরেও আমাদের পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতের পাঞ্জাব, মহারাষ্ট্র, জম্মু-কাশ্মিরে রাজ্যসহ ইউরোপের অনেক দেশে এখন এই সিগারেট নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছে স্থানীয় সরকারের মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরগুলো।যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্যের বেশ কয়েকজন স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের একাধিক গবেষণায় উঠে এসেছে, ব্যাটারি-চালিত এই ই-সিগারেটগুলো কোন অংশেই সিগারেটের চেয়ে কম ক্ষতিকর নয়। বলা হয়েছে নিয়মিত এই যন্ত্র ব্যবহার করলে ব্যবহারকারী আক্রান্ত হতে পারে উচ্চরক্তচাপ, হার্ট-অ্যাটাক, নিউমোনিয়া, ক্যান্সারের মত ভয়ানক রোগে।লন্ডনের বোস্টন বিশ্ববিদ্যালয়, কুইন মেরি বিশ্ববিদ্যালয় এবং নিউইয়র্কের ইউনিভার্সিটি স্কুল অব মেডিসিনের আলাদা তিনটি গবেষণাতে একই তথ্য উঠে এসেছে। যেখানে বলা হয়, ই-সিগারেটের ফ্লেভার তৈরিতে যে রাসায়নিক দ্রব্য ব্যবহৃত হচ্ছে তা মানবদেহের ধমনী, শিরা এবং হৃদপিন্ডে প্রদাহ সৃষ্টি করে। যাতে মানব দেহের শিরায় নাইট্রিক এসিডের পরিমাণ কমিয়ে দেয়। যার ফলে রক্ত চলাচলের পথ সংকুচিত হয়ে উচ্চ রক্তচাপ সৃষ্টি হচ্ছে। যাতে করে ঝুঁকি বেড়ে যাচ্ছে হার্ট অ্যাটাক বা স্ট্রোকের ও ক্যান্সারের ঝুঁকি। এমনকি সেবনকারী আক্রন্ত হয় নিউমোনিয়াতে।এই বিষয়ে ঢাকা মেডিকেল কলেজ থেকে লেখা পড়া শেষ করে বর্তমানে অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্যান্সার এপিডেমিওলজি বিষয়ে গবেষক হিসেবে কর্মরত ডাঃ সাজেদুর রহমান। তিনি বিডি২৪লাইভকে বলেন, ‘ই-সিগারেট হচ্ছে ধূমপান ছাড়ার সাময়িক ব্যবহারের জন্য। কিন্তু ই- সিগারেটে ফ্লেভারে (নিকোটিন) ব্যবহার হচ্ছে প্রায় ৬৯টি মত রাসায়নিক দ্রব্য। যা সরাসরি ক্যানসারের জন্য দায়ী।’সাজেদুর রহমান আরও বলেন, ‘বাংলাদেশের ভ্যাপিং এর বর্তমান অবস্থা খুবই খারাপ সোশ্যাল মিডিয়াতে ঘুরাঘুরি করলেই বুঝা যায়।

 

বিক্রির জন্য ইলেকট্রনিক সিগারেটগুলোকে কম ক্ষতিকর বলে প্রচার করা হচ্ছে, যা মোটেও সত্য নয়।’প্রসঙ্গত, ৩ বছর আগে ২০১৫ সালে ক্যালিফোর্নিয়া হেলথ ডিপার্টমেন্ট অব পাবলিক হেলথে প্রকাশিত একটি প্রতিবেদনে বলেছিলেন, ই-সিগারেট মানুষের জন্য হুমকিস্বরূপ এবং এটিকে আইনের আওতায় আনা উচিত।মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে প্রধান রাসায়নিক পরিক্ষক ড. দুলাল কৃষ্ণ সাহার কাছে ই- সিগারেট এর ফ্লেভার (নিকোটিন) নিয়ে কোনো পরিক্ষার ফলাফল আছে কি না জানতে চাওয়া হলে তিনি জানান, তাদের পরীক্ষাগারে এখন পর্যন্ত এই বিষয়ে কোনো রাসায়নিক পরীক্ষা হয়নি।মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরে অতিরিক্ত মহাপরিচালক সঞ্জয় কুমার চৌধুরী সাথে কেন এই মরণব্যধি ই-সিগারেট/ ভ্যাপ কে কেনো মাদকের তালিকাভুক্ত করা হচ্ছে না, এমন প্রশ্নের নিদিষ্ট কোনো উত্তর না দিতে পারলেও তিনি নিশ্চিত করেন সামনের বোর্ড মিটিং এর সময় ভ্যাপিং / ই-সিগারেট এবং এর ফ্লেভারের বিষয়টি তুলে ধরবেন।

 

 

 

ই-বার্তা।ডেস্ক