হাস্যরসে উজ্জ্বল নজরুল


ই-বার্তা প্রকাশিত: ২৫শে মে ২০১৭, বৃহঃস্পতিবার  | দুপুর ০২:১০ গদ্য

আফিফা মোহসিনা অরণি।। কাজী নজরুল ইসলাম ব্যক্তিগত জীবনে ছিলেন অত্যন্ত রসিক। তিনি নিজে অনেক হাসতেন এবং অন্যদেরও হাসাতেন। যেকোনো মজলিশে নজরুল ছিলেন মধ্যমণি। তাঁর আশেপাশের সকলকে তিনি সবসময় তাঁর হাস্যরস দিয়ে মাতিয়ে রাখতেন। এমন কিছু মজার ঘটনা ই-বার্তার দর্শকদের উদ্দেশ্যে দেয়া হোলো।

ঘটনা ১।
একবার নজরুল গেছেন সিরাজগঞ্জে, আসাদ উদ-দৌলা সিরাজীর বাসায়। খাওয়া দাওয়ার পর সবাইকে দই দেয়া হলো। কিন্তু সে দই আগে ভাগেই নিয়ে আসাতে নষ্ট হয়ে গিয়েছিল। আর তা খেয়ে নজরুল আসাদ উদ-দৌলার দিকে তাকিয়ে চোখেমুখে অদ্ভুত ভঙ্গি করে বললেন, “তুমি কি এই দই তেতুঁল গাছ থেকে পেড়ে নিয়ে এলে নাকি”?

ঘটনা ২।
নজরুলকে একবার কেউ জিজ্ঞেস করেছিল, আপনি রঙীন জামা পরেন কেন? “সভায় অনেক লোকের মধ্যে যাতে চট করে চোখে পড়ে তাই” -বলে হেসে উঠেছেন তিনি।

ঘটনা ৩।
কবির এক বন্ধু ছিলেন, নাম শৈলেন। কবি তাঁর কাছ থেকে সবসময় চা খেতেন। আর প্রতিদিন চা খাওয়ার জন্য নিত্যনতুন ফন্দি আঁটতেন। একদিন আর কোনো ফন্দি না পেয়ে কবি শৈলেনের কাছে গিয়ে বললেন, “তুমি তো অনেক টাকা পাবে আমার কাছে, হিসেব করে রেখো, আপাতত দু পেয়ালা চা দাও”। শৈলেন তো অবাক! অনেক টাকা পাওয়ার সঙ্গে দুই কাপ চায়ের কী সম্পর্ক? তিনি নজরুলের কাছে জানতে চাইলেন, “দুই পেয়ালা কেন”? কবি বললেন, “ লাখ পেয়ালা চা না খেলে টাকা হয় না। লাখ পেয়ালা হতে আমার এখনও দু-পেয়ালা বাকি আছে”। এমন কথার পর কোনো বন্ধু চা না খাইয়ে থাকতে পারে, বলুন?


ঘটনা ৪।
নজরুল একবার মফস্বলের কোনো এক গ্রাম ঘুরে এসে সওগাত পত্রিকার মজলিসে বসে হাসতে হাসতে বলে উঠলেন, “আল্লারে, বিল্লা এক্করে হাল্ দিয়া উত্কা মাইরা বাইরে পইড়্যা গেছে। আমি জমাইছি মেকুরডা চাইয়া দেহি বিল্লিডা”। ঘরশুদ্ধ লোক হেসে অস্থির। পরে জানা গেল গ্রামে গিয়ে তিনি যে বাড়িতে ছিলেন সেখানে রাতে জানালা দিয়ে একটি বিড়াল অন্য একটি বিড়ালকে তাড়া করে লাফ দিয়ে বাইরে গিয়ে পড়েছিল। কী হলো ভেবে বাড়ির একটা লোক গ্রাম্য ভাষায় এই কথাগুলো বলছিল। আর নজরুল তার হুবহ বয়ান করলেন।

ঘটনা ৫।
কোনো একদিন কলকাতায় কবির বাড়িতে কয়েকজন মিলে গল্পগুজব করছেন। সেখানে একজন অ-বাঙালি ভদ্রলোকও ছিলেন। একসময় তার সাথে কবির হিন্দি বনাম বাংলা নিয়ে তুলনামূলক আলোচনা হচ্ছিল। ভদ্রলোকটি হিন্দি ভাষার জন্য ওকালতি করছিলেন। কবি হাসতে হাসতে বললেন, “যাও! যাও! তোমাদের হিন্দি ভাষা তো কুকুর বেড়ালের ভাষা”। শুনে ভদ্রলোকটি রেগে বললেন, “কেঁও”? অমনি কবি বলে উঠলেন, “ওই দেখ কুকুরের ডাক ডাকলে”। ভদ্রলোকটি কবির কথায় রাগ না করে হেসে বললেন, “হুয়া হুয়া”। কবি বললেন, “ওই দেখ শিয়ালের ডাক ডাকলে, আমি ঠিক বলিনি”? উপস্থিত সকলেই এই রসালাপে হাসতে হাসতে লুটিয়ে পড়লেন।

ঘটনা ৬।
একবার নজরুলের কাছে গ্রামোফোন কোম্পানিতে রেকর্ডে গানের পরীক্ষা দিতে এলেন এক লোক। লোকটি হারমোনিয়াম নিয়ে কবির সামনে বসে গান শুরু না করে কথা শুরু করলেন। কার কাছে গান শিখেছেন, তাঁর গান শুনে কে প্রশংসা করেছে, তিনি কতখানি পাণ্ডিত্যের অধিকারী ইত্যাদি। এমনকি কবির জ্ঞ্যান নিয়েও প্রশ্ন করে বসলেন তিনি, “আপনি কি ধানশ্রী ভৈরবী রাগের গান শুনেছেন? শোনেননি বোধহয়। কেবল আমার কাছেই আছে”। নজরুল তখন বিরক্ত হয়ে বললেন, “আপনি তো দেখছি একটি জানোয়ার লোক”। লোকটি নজরুলের কথায় বেশ উত্তেজিত হয়ে উঠল। নজরুল বললেন, “না না অন্য কিছু মনে করবেন না, দেখলাম আপনি অনেক কিছু জানেন, তাই আপনার সম্বন্ধে ‘জানোয়ার’ শব্দটি প্রয়োগ করেছি”। লোকটি হাঁ করে বসে রইল।

এমনই রসিক মানুষ ছিলেন নজরুল। যার জীবনে দুঃখ-কষ্টের অভাব ছিল না, আবার হাসি-ঠাট্টারও অভাব ছিল না।

সর্বশেষ সংবাদ

গদ্য এর আরও সংবাদ