মুকুলিমা কিংবা জলপূর্ণিমার গল্প


ই-বার্তা প্রকাশিত: ১লা এপ্রিল ২০১৭, শনিবার  | রাত ১০:১৮ গদ্য

সকাল রয়

১.
ট্রেন থেকে নেমে মুকু স্টেশনে দাঁড়িয়েছিল অনেকক্ষণ। অফিস থেকে জানিয়েছিল তাকে নিতে কেউ একজন আসবে। সেটা ভেবেই হাতের ভাজে পেপার নিয়ে অপেক্ষা করছিল সে, কিন্তু তার আর কোন দেখা মিলল না। কেউ এলো না, সন্ধ্যে ফুরিয়ে আসছিল, রাস্তায় সোডিয়ামের বাতি গুলে জ্বলে উঠছিল একটার পর একটা। স্টেশনের ভীড় হালকা হয়ে আসতেই মুকু ভাবল দাড়িয়ে না থেকে অপেক্ষা বাদ দিয়ে গন্তব্যের দিকে গেলেই হয়।
ব্যাগ থেকে ঠিকানাটা বের করে একটিবার চোখ বুলিয়ে হাটা ধরলো। প্লাটফর্ম পেরোবার পর দেখতে পেল ছোট্ট একটা বাজার। এক গলির বাজারটা অনেকটা গ্রাম্য হাটের মতো। ভেবেছিল রিকসা নিয়ে যেতে হবে কিন্তু একটু এগিয়ে দেখলো সি.এন.জি দাড়িয়ে আছে এখানে-ওখানে। ড্রাইভারকে ঠিকানা দেখিয়ে দিয়ে উঠে বসলো। শীতের রাত বলে চাদর জড়িয়ে নিল গায়ে। ড্রাইভার বললো এখান থেকে প্রায় পনের কিলোমিটারের মত পথ। পার্স থেকে সেলফোনটা বের করে অফিসের নাম্বারে একটা ফোন দিয়ে বললো, স্যার আমি মুকুলিমা চৌধুরী বলছি, স্টেশনে কেউ আসেনি দেখে আমি নিজেই সি.এন.জি নিয়ে চলে আসছি।

মুকুকে নিয়ে সি.এন.জি যখন কংস ব্রীজের উপরে উঠেছে তখন ট্রেন তার হুইসেলের শব্দে চারপাশ কাঁপিয়ে দিয়ে পুনরায় চলতে শুরু করেছে। ব্রীজের উপর থেকেই কংস নদীর দুধারে আলোর খেলা দেখা যাচ্ছিল। মুকু চোখের চশমাটা মুছে নিয়ে সেই সব আলোর ঝলকানি গায়ে মেখে নিল। ব্রীজ পেরিয়ে ঝানজাইল বাজারে আসতেই দেখা গেল গ্রাম্য বাজার আলোর লণ্ঠন জ্বেলে মাছওয়ালারা বসে আছে, ঘুঘনি আর তেলে ভাজার দোকান থেকে আসছে উত্তপ্ত ঝাঁজ। নাকে সে ঝাঁজের গন্ধ লাগতেই মুকুর মনে হলো কতদিন তেলেভাজা খাওয়া হয়না। বাড়িতে থাকলে সেসব বারন। তাছাড়া কারো সাথে কোথাও বেড়াতে গেলে তবেই না খাওয়া হয়। বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকে যাবার পর মুকুর সেরকম কোন ব্যবস্থা ছিলনা বাইরে বেরুবার। পারিবারিক কলহের চাপে নিজেকে বন্দি করেছিলো চার দেয়ালের ভেতর। যাকে বলে স্বেচ্ছা নির্বাসন। একদিন কি সব ভেবে চাকুরীতে আবেদন করে বসলো। ব্যাস হয়ে গেল। সি.এন.জি তে বসে ভাবছিল এখন এখানে নেমে দিব্যি সে খেয়ে নিয়ে পারে কিন্তু তাতে রাত বাড়বে।


পথ চলতে চলতে সি.এন.জি কৃষ্ণেরচর হাইস্কুলের সামনে এসে দাঁড়ালো ড্রাইভার বললো ম্যাডাম ঠান্ডা তো বেড়ে যাচ্ছে, একটু চা খেয়ে নিন? নয়তো বসতে পারবেন না গায়ে কাঁপুনি দেবে।
মুকু সি.এন.জি থেকে বেড়িয়ে বাইরে দাড়িয়ে চোখ খুলে দেখলো স্কুলের মাঠে বেশ খানিকটা জায়গা জুড়ে জোনাকির মেলা। আকাশ ভর্তি উজ্জল জোছনা। চারপাশটা কেমন যেন মায়া মায়া। ড্রাইভার চা এনে দিল। ফুঁইয়ে খেতে হলো চা। গাড়ির ভেতরে ঢুকবার পর মনে হলো জোনাক ভীড় করে আছে চারপাশ। সি.এন.জির সাথে সাথে জোনাক গুলো চলতে লাগলো।
মুকু জেনেছিল যেখানে সে পোস্টিং পাচ্ছে সেখান থেকে মেঘালয়ের পাহাড় দেখা যায়। সবুজাভ পাহাড়। প্রকৃতির অপরূপ মায়ময় সৌন্দর্য্য ঘেরা মফস্বল এলাকা। মুকুকে যে কোয়ার্টার দেয়া হয়েছে সেখান থেকে সোমেশ্বরী নদী দু’মিনিটের হাটা পথ। মুকু প্রথমে ভেবেছিলে চাকুরী নিয়ে অতদূর, অজানা, অচেনা গ্রামে যাবার কোন মানে হয়? তারপর যখন জানতে পেল পাহাড়ি একটা গ্রাম, নিরীহ মানুষের জনপথ, কোন হট্টগোল নেই তখন রাজী হয়ে গেল তাছাড়া শহুরে জীবন বড় যান্ত্রিক। বাঙলার রুপ চোখ ভরে দেখা হয়ে উঠেনি তার তাই দেখাই যাক না কেমন লাগে সুসং নগর।


.২.
সকালে মুকুর ঘুম ভাঙ্গতেই মনে হলো ঘরের কোনে কোকিল ডাকছে যেন। উঠে জানালা খুলতেই বড় একটা কৃষ্ণচূড়া গাছে চোখে পড়লো গাছ ভরতি দুর্দান্ত- কৃষ্ণচূড়া প্রেম ঝুলে আছে। ব্যালকনিতে দাঁড়াতেই মেঘালয়ের পাহাড় ভেসে উঠলো চোখে। বিজয় পুরের সবুজাভ পাহাড়। মনকাড়া সোমেশ্বরী নদী আর উত্তপ্ত বালুচর চারপাশে এত শস্য-শ্যামল প্রকৃতি দেখলেই মনটা কেমন নেচে উঠে। মুকুর সব জড়তা কেটে গেল। ওর চাকুরী জীবনের প্রথম কর্মস্থল এই নৃ-তাত্ত্বিক একাডেমীতে, সহকারী পরিচালক পদে।
প্রথম বারের মতো চাকুরীতে ঢুকেছে সে। সবকিছু বুঝে নিতে বেশ কদিন সময় লাগলে তার। অফিসে সবার সাথে পরিচয় হতে গিয়ে হলো এক বিপত্তি। পরিচালক যিনি তিনি খ্রিষ্টান। শুদ্ধ বাঙলা বললে ভাঙা ভাঙা শোনায়, মুকু সহজে বুঝে উঠতে পারেনা। তাছাড়া অফিসের বেশির ভাগ কলিগ ই গারো ভাষায় কথা বলে। যে কারণে ওদের সাথে মেশাটাই কঠিন হয়ে দাঁড়ালো। শুধু এ্যাকাউন্ট বিভাগের রুপম সাহেব ছাড়া। উনি বাঙালী ক্রিশ্চিয়ান বলে বাংলাতেই ভালো বলেন।

সন্ধ্যেয় কোয়ার্টারে ফিরবার পর কোয়ার্টার ক্যান্টিনে প্রায়ই সব শ্রেণীর মানুষদের নিয়েই আড্ডা হয়। গারো ভাষার গান বেজে উঠে। কখনোবা সাঁওতালি নৃত্য। সুসং নগর যেন বাঙলার ভূস্বর্গ। সপ্তাহে ছ’দিন ডিউটি মুকু’র। কবিতা আর আবৃত্তি নিয়ে প্রতি বৃহস্পতিবার ঘরোয়া অনুষ্ঠান হয়। বার্ষিক একটা মেলা হয়। মুকুর চাকুরীতে যোগদান করবার পরই জানতে পারলো ছ’মাস পর মেলার তারিখ। সে জন্য প্রথম চারমাসের জন্য প্রতিবেদন তৈরীর কাজ নিয়ে ব্যাস- থাকতে হবে।
কবিতা বিভাগের দায়িত্বটাও ওকেই নিতে হলো বার্ষিক সাহিত্য ম্যাগ প্রকাশিত করার পুরো কাজ ওরা ছজন মিলে করবে। ও যেহেতু এখানে নতুন তাই রুপম সহ বাকীরা মুকুকে সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিলেন।


ভাষার জন্য প্রথমে গা ছাড়া ভাব হয়ে গেলেও মুকু প্রথম মাস পেরুতেই বুঝতে পারলো এখানকার মানুষ গুলো খুব মিশুক। গারো, হাজং শ্রেণীর মানুষগুলো বেশ মজার। আর যাই হোক শহুরে বাঙালীর মতো হিংসুক আর সময় অপচয়কারী নয়। ছুটির দিনে মুকু প্রায়ই ঘুরতে বেরোয় সাথে থাকে একদল গারো তরুন-তরুণী। গাইড দেবার কাজটা অবশ্য রুপম বাবুই নিয়েছেন। পথ চলতে গিয়ে কতরকম কথাতেই ভাসে ওরা।
রুপম কথায় কথায় জীবনানন্দকে টেনে আনে। রুপসী বাংলা মানেই জীবনানন্দ। এক পিঠে যদি হয় বাংলা অপর পিঠে তার জীবনানন্দ। রুপম বেশ নাড়া দিয়ে কথা বলতে জানে। একদিন পাইন গাছ দেখিয়ে বললো আপনি যদি পাইন হতে তবে আমি হতাম সাদা মেঘের বক। মুকু বললো পাইন গাছ হবার স্বাদ নেই রুপম তাহলে একদিন ঝড়ে ভেঙ্গে পড়বো। রুপম বললো তাহলে আমি নদী হবো? মুকু হেসে বললো ছেলেরা কখনো নদী হতে পারেনা?
রুপম বললো আপনি কখনো প্রেম করেছেন? মুকু বললো আপনাকে বলবো কেন? “ নাইবা বললেন তবে যদি কোনদিন সাধ হয় তো বলবেন, সাদা বক হয়ে যাবো মুকুলিমার চোখ নদীতে”। আরো কথায় সেদিন ভেসে গেলো ওরা।
মুকু পথে হাঁটছিল আর ভাবছিল ওর জীবনটা এতকাল খালের ধারে হারিয়ে যাওয়া একটা বালিহাঁস কিংবা হলুদ ফুলে পথ হারানো একটা নীল প্রজাপ্রতির মতো চলছিল। মুকু জানে এভাবে জীবন চলে না। বিষণ্নতাকে সুর্যের মতো ডুবিয়ে দিয়ে জোছনার সংসার করা প্রয়োজন। রুপমকে ভালো লাগে ওর কিন্তু রুপম কি সত্যিই মুকু কে ভালোবাসে?
বাঙলার অপরূপ ভূস্বর্গ এই সুসং নগরীরর পথে পথে ঘুড়ে বেড়িয়ে দুর্দান্ত- প্রজাপ্রতির পেছনে পেছনে ছুটতে ছুটতে মুকু নিজেকে খুজে পেয়েছে নতুন রুপে। ওর গানের গলা আবার ফিরে এসেছে। জীবন পথের তরীতে কাউকে তুলে নিলে বেশ চলে যাবে। রুপমকে ভালো লাগে মুকুর, কিন্তু সাহস করে বলা হয় না।


...৩...
রুপম প্রথম দিন বলেছিল মুকু ম্যাডাম আপনি যখন একবার সুসং নগরে পা রেখেছেন তখন পা উঠিয়ে নেবার আগেই প্রেমে পড়ে যাবেন এই নগরের। তখন এই কথাটা গায়ে মাখেনি কিন্ত এখন মনে হচ্ছে সেটাই ঠিক। শহুরে মানুষগুলোর আহামরি অহঙ্কার আর দৈনন্দিন কলহের চেয়ে এখানকার কারো প্রেম ভেসে গিয়ে হিজল তমালের মতো এখানে জীবনটা কাটিয়ে দিলে মন্দ হবেনা। বিজয়পুরের ফ্রুট ভিলেজের পাশে ছোট একটা ঘর বেধে প্রতিদিন পাহাড়ি গাছের শুঁকনো পাতা মাড়িয়ে উত্তাল সোমেশ্বরীর বুকে নৌকার পাল তুলে ভেসে যেতে পারলে মনে হবে স্বর্গে ঘুড়ে বেড়াচ্ছি।
মেলা শুরু হয়েছে চারদিন হলো। আজ শেষদিন মেলার দিনগুলো খুব ব্যাস্ততায় কাটলেও শেষের দিনটাতে ওরা সবাই ছুটি পেয়েছিল। মেলায় হরেক রকমের আয়োজন, নাচ-গান, নাটক, বাঙলার রুপ নিয়ে প্রবন্ধ, কবিতার আয়োজন ছিল। রাখাইন তরুণীদের সাথে বেশ মজা করে সারাটা বিকেল-দুপুর কাটিয়ে যখন বাড়ি ফিরবে তখন হঠাৎ মেলায় হৈ-চৈ শুনতে পেল মুকু। নাটকের রিহার্সেল ভেবে মেলা থেকে বেড়িয়ে শুনলো ভেতরে দারুণ গণ্ডগোল চলছে।


মেলা থেকে ফিরবার পর মুকুর মনে হলো আজকের সন্ধ্যাটা বেশ চমৎকার কেটেছে। রুপমের অভিনয় বেশ। এখানকার মানুষ গুলো যে সত্যিই একেকটা প্রজাপ্রতি সে কথাটা আজ বুঝতে পারলো সে। অভিনয় মঞ্চ ছাড়া আজ রুপমের দেখা মেলেনি, কালকেও ছিলনা। দুপুরে ক্যান্টিনে ও দেখা পাওয়া যায়নি। সবাই জানে ভর দুপুরের ক্যান্টিন সমাচার মানেই রুপম বাবুর কড়চা। ক্যান্টিনটি চারদিন ধরে শীতল হয়ে আছে।
ঘরে ফিরে উত্তরের জানালায় তাকিয়ে নিচের ধানি জমি দেখছিল মুকু হঠাৎ নিচতলায় শোরগোল শুনলো, তারপর চিৎকার, চেচাঁমেচি।
কি হলো? কি হলো? বলে মুকু সিড়ি মাড়িয়ে নিচে নামতেই দেখতে পেল ছোট একটা জটলা। রুপমের বোন দাড়িয়ে আছে পাশে বুড়ো মতন একটা লোক কাঁদছে। পাশে যেতেই জানতে পেল কয়েকজন রাখাইন মেয়ে নিঁখোজ। নদীর ধারে একজনের লাশ পাওয়া গেছে। কখন ঘটলো এসব! মেয়েটা নাকি একা একা ঘুরছিল। ওদের সাথে আসা স্বজনরা ইতিমধ্যে হট্টগোল শুরু করে দিয়েছে। সোমেশ্বরী ব্রীজ পুলিশের দল ঘিরে ফেলেছে বিরিশিরির চারপাশ। কথাগুলো শুনেও ভয়ে আতকে উঠলো মুকু এখানেও শয়তানের পদচারনা। বুড়োরা বলছিল একাকী ঘোরাফেরা বড্ড বিপজ্জনক অন্তত রাতের বেলা তো নয়ই।
মুকুর মাথায় কথা গুলো জেগে উঠলো। ওর জীবনটাও তো শূন্য! মা-ভাইদের সাথে থাকা হলো না। বয়েস পেরিয়ে যাচ্ছে সংসার করা প্রয়োজন কিন্তু কে ভাবে সে কথা। আর যাই হোক এ বয়সে একা থাকা নিতান্তই বিপদের কাধে টোকা দেবার সমান। নিজেকেই ভাবতে হবে নিজের জন্য। কদিন ধরে মুকু ভাবছিল রুপমকে বলবে।

রাতভর তল্লাশি চললো পুরো নগর জুড়ে। চারতলা থেকে কিছুতেই মুকুকে সহ কাউকেই নিচে নামতে দেয়নি পুলিশ। মেলায় রাতেই কারা যেন অগ্নি সংযোগ করলো। হঠাৎ করেই শান- এই নগরীতে শয়তানের ছায়া পড়লো যেন। রাতে কোন খবর নেয়াই সম্ভব হলোনা। রুপমের সেলফোন বন্ধ, উৎকণ্ঠায় কিছুতেই রাত কাটছে না মুকুর। কোথায় আছে? কেমন আছে রুপম? অফিসের যাদের নাম্বারেই ফোন দেয়া হলো সবাই বললো রুপমকে দেখেনি।
অবিচ্ছেদ কান্নার সুর দিয়ে সকাল হলো। নিচে নেমে মুকু দেখলো মেলা প্রাঙ্গন ছিন্নভিন্ন। রাখাইন মেয়েদেরকে পাওয়া গেছে। একজনের মৃতদেহ ভোর রাতে থানায় নিয়ে গেছে। যারা নারীঘটিত বিষয় নিয়ে লঙ্কাকাণ্ড ঘটিয়েছিল তারা এখন জেল-হাজতে। মুকু প্রথমে থানায় খোঁজ নিলো কিন্তু সেখানে রুপমের নাম নেই। মেলা প্রাঙ্গন বা বাসাতেও নেই। তার মানে রুপম নিখোঁজ। ওর চোখ জলে ভরে উঠবার আগেই শরীরটা দুলে উঠলো।



....৪....
রুপম নেই ভাবাই যায় না। এত কম সময়ে কেউ যখন পূর্ণিমার আকাশ হয়ে যায় তখন সে আকাশকে বিষাক্ত মনে হয়। রুপমের চলে যাওয়া মুকুকে সর্বতঃ ভাবে থামিয়ে দিয়েছিল। জীবনকে নিয়ে স্বপ্ন দেখার পথকে শূন্য করে দিয়েছিল। হয়তো রুপম এখন নগরের বুনো শালিক।
সেই ক্যান্টিন এখন বিষাদময়। অফিসেও মন বসে না। কবিতা আবৃত্তি করতে গেলে গলায় শব্দ শকট ভর করে। গান গুলো বেসুরো হয়ে যাচ্ছে ক্রমশই। মুকু যে নবানন্দে ভেসেছিল প্রকৃতির নীলাচলে তার পূর্ণতা রুপমকে ছাড়া অসম্পূর্ণ হয়ে গেল।
রুপমকে ছাড়া সুসং নগরীর বাদামী পথ, হলিনেস চার্চ, রানীখংয়ের উচু পাহাড় গুলো মুকু কে কাঁদাবে!
প্রকৃতি কন্যা সোমেশ্বরীর স্রোতের মতো মুকুকে শুধু ভাসাবে। মরে যাওয়া হয়ত সহজ কিন্তু জীবন থেকে পালিয়ে বেড়ানো সে বড় কঠিন কাজ। তবুও চলতে হবে এভাবেই। মুকুর আর বলা হলো না রুপমকে; পাইন বনের ভালোবাসার কথা।

মুকু একদিন ঠিক করে নিলো, চলে যাবে দূরে কোথাও যেখানে রুপমের স্মৃতি তাকে কাঁদাবে না। বাঙলার আকাশ মাথায় নিয়ে, চোখ ভরতি জল পূর্ণিমা নিয়ে চলে যাবে সে দূরের কোন শহরে।
সুসং নগর ছাড়বার দিন শেষবারের মতো জানালা বন্ধ করতে গিয়ে মুকু দেখলো সেই কৃষ্ণচূড়ার গাছ ভরতি প্রেম। সজনে ডাটায় অভিমান ঝুলে আছে। শরতের আকাশ ভর্তি তুলো মেঘ আকাশকে ধরে রেখেছে সেই আগের মতো। ব্যাগ-পত্তর নিয়ে মুকু যখন এসে দাঁড়ালো সোমেশ্বরীর তীরে। তখন দূরের গগনে সূর্য গাইছে সকাল সঙ্গীত। আবছা আলোর ধানি জমির দিকে তাকিয়ে মনে হলো রুপম মিশে আছে এই বাঙলার মাটিতে, যেখানে ঘাতক বুলেট কেড়ে নিয়েছিল ওর প্রাণ। কে জানে রুপম হয়তোবা এখন কোথাও ঘুড়ে বেড়াচ্ছে জীবনানন্দের মতো শঙ্খচিল অথবা শালিকের বেশে।

সর্বশেষ সংবাদ

গদ্য এর আরও সংবাদ