সাদা মনের মানুষ সুব্রত ভট্টাচার্য- দশম পর্ব


ই-বার্তা প্রকাশিত: ৩রা জুলাই ২০১৭, সোমবার  | দুপুর ০২:৩৯ দেশ

ছবি- সুব্রত ভট্টাচার্যের সাথে বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলামের ভাতিজা কাজী রেজাউল করিম।

"অনেকের ধারনা আমি ধর্ম মানি না। ঈশ্বরে বিশ্বাস করিনা। মন্দির, শ্মশান, উপাসনালয় আমার জন্য না। তাহলে আমি কে? আমি কি মানুষ না? মানুষের জন্যই তো ধর্ম। আমি ষোলআনা ধর্মে বিশ্বাস করি কিন্তু আচারিক ধর্ম মানি না। আমি পরিপূর্ণ ঈশ্বরে বিশ্বাস করি। আর করি বলেই নিয়মিত আধ্যাত্মিক সাধনা আমার একমাত্র নেশা। যে সাধনা আমায় মানুষকে ভালোবাসতে শেখায় এবং সৎ ও মহৎ থাকবার অঙ্গীকারে অঙ্গীকারাবদ্ধ করে তোলে। আমি মানুষের মাঝেই ঈশ্বরকে খুঁজে পাই। মন্দিরে আমি ১০০ বার যাবো কিন্তু যে মন্দিরে প্রকৃত ধর্মচর্চা বাদ দিয়ে পুরোহিত মশাইগণ আচার ধর্ম প্রচার করেন সে মন্দিরে আমি যাবো না। আমি শ্মশানে অন্ত্যষ্টিক্রিয়ায় অংশগ্রহণে অবশ্যই যাবো কিন্তু যে শ্মশানে আমার স্ত্রী, বাবা, মা কিংবা পরিচিতজনদের অন্ত্যষ্টিক্রিয়া শেষে স্নান করে মহা পবিত্র না হওয়া পর্যন্ত বাড়ি- ঘরে প্রবেশ করাতো দুরের কথা খাবার পর্যন্ত স্পর্শ করা যাবে না, সে শ্মশানে আমি যাবো না। তবে সমাজ এবং ধর্মকে আমি শ্রদ্ধা করি বলেই শ্মশানে যাবো কিন্তু অহেতুক লোকসৃষ্ট আচার ধর্ম (যা পবিত্র বেদে নেই) আমার পক্ষে মেনে চলা অসম্ভব। যে ধর্ম বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর কি শীত-কি বসন্ত, কি গ্রীস্ম-কি বর্ষায় মাথা ন্যাড়া করে, গলায় একটা পৈতা ঝুলিয়ে, পরনে শুধু ধুতি রেখে খালি গায় ও খালি পায়ে বারো দিন, পনেরো দিন কিংবা এক মাস (জাত ভেদে) থাকতে বলে, তাও আবার এক কাপড়ে, সে আচার নামক পৌরাণিক কুসংস্কারাচ্ছন্ন ধর্ম আমি মানি না। এ আচার নামক ধর্ম মেনে খাঁচায় বন্দি থাকা আমার পক্ষে সম্ভব নয়। কারণ, পবিত্র বেদের কোথাও উল্লেখ নেই যে বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর ঐ ভাবে মলিন বেশে আর উষ্ক-খুষ্কো রোগাক্রান্ত শরীর নিয়ে অহেতুক এতটা দিন থাকতে হবে। আমার এ বক্তব্য শোনার পর সবাই যদি আমাকে ছেড়ে চলে যায় আপত্তি নেই কিন্তু আমি মানুষকে ছাড়তে পারবো না। সব ধর্মের মানুষ আমার কাছে অক্সিজেন স্বরুপ। অক্সিজেন ছাড়া কেউ বাঁচে? তাই, মানুষ ধর্মই আমার কাছে একমাত্র ধর্ম”। সুব্রত ভট্টাচার্য তাঁর ভক্তদের মাঝে স্বতঃস্ফূর্তভাবে এবং উদাত্ত কন্ঠে এসব প্রতিবাদী উচ্চারণ দৃঢ়তার সাথে বলেন আর সেইসাথে তরুণ প্রজন্মকে এ ব্যাপারে সচেতন হওয়ারও আহবান করেন।

সুব্রত ভট্টাচার্যের পক্ষেই এ আহবান মানায় বলে তিনি মৃত্যু অবধি একথা বলে যাবেন। বলবেন না কেন? তিনি যে স্বাধীন। স্বাধীন কথার অর্থ জানা আছে পাঠক? স্ব+অধীন = স্বাধীন । স্ব, মানে বিবেক, ঈশ্বর । আর অধীন মানে হয়ে, দাস, চাকর, কর্মচারি ইত্যাদি। অর্থাৎ যে মানুষ বিবেকের বা ঈশ্বরের হয়ে চলবে সেই সম্পূর্ণ স্বাধীন। তাই, সুব্রত ভট্টাচার্যের আর কোনো কিছুতেই কোনো ভয় নেই।

ব্যক্তিগত জীবনে তাঁর আর একটি বিশেষ গুণ, তিনি পবিত্র কোরআন, বেদ, বাইবেল, ত্রিপিটক সম্পর্কে সম্মক জ্ঞান অর্জন করেছেন। এসব পবিত্র গ্রন্থ সম্পর্কে তিনি সবসময়ই বলেন যারা যারা যে যে ধর্মই পালন করুক না কেন নিজ নিজ ধর্মের নিজ নিজ ধর্মগ্রন্থ সম্পর্কে পুরোপুরি জ্ঞান থাকা খুবই জরুরী। ধর্মগ্রন্থ না পড়ে, না জেনে ধর্মের বড়াই করা ঠিক না। আবার ধর্ম গ্রন্থের নির্দেশানুযায়ী আমল কিংবা ইবাদত কিংবা আধ্যাত্ম সাধনা প্রত্যেক মানুষের জন্য একটি অবশ্যম্ভাবী রুটিন মাফিক কাজ। সুব্রত ভট্টাচার্য অত্যন্ত দাপটের সাথে যে বিষয়টি সবার উদ্দেশ্যে বলেন তা হচ্ছে, যারা পবিত্র কোরআন, বেদ, বাইবেল, ত্রিপিটক ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থ পাঠ করার পর মিথ্যাচার, ভন্ডামি ,ঘুষ, সুদ, দুর্নীতি, ও মানুষ খুনের মতো জঘন্য কাজ করেন তারা ধর্মের নামে করেন ছ্যাবলামো। আর যারা পবিত্র কোরআন, বেদ, বাইবেল, ত্রিপিটক ইত্যাদি ধর্মগ্রন্থ পাঠ না করে কিংবা না জেনে বড় বড় জ্ঞানের কথা বলেন তারা করেন পাগলামো। এবং যারা কিতাবও পড়েন না, আমল কিংবা আধ্যাত্ম সাধনাও করেন না আবার জ্ঞান সঞ্চয়ও করেন না, তারা করেন আতলামো। এ ব্যাপারে সুব্রত ভট্টাচার্য বলেন, "আমি ছ্যাবলামোদের দলেও নেই, পাগলামোদের দলেও নেই আর আতলামোদের দলে? প্রশ্নই আসেনা। আমি শুধু সত্য আর সুন্দরের দলে। যে দলের নির্দেশক আমার অনাদিকালের অনন্ত ঈশ্বর, আমার সৃষ্টিকর্তা"।

একেই বলে পান্ডিত্য আর জ্ঞানগর্ভ মুক্ত কথন। একেই বলে জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে সঠিক পথে চলার বলিষ্ঠ শপথ। যে শপথ হাজারো ঝড়,ঝঞ্ঝা,টর্ণেডো আর শিলাবৃষ্টিতে ভাঙবেও না, মচকাবেও না । যে শপথ চিনের প্রাচীরকেও চ্যালেন্জ ছুঁড়ে দিতে পারে অনায়াসেই।

সুব্রত ভট্টাচার্যের অনেকগুলো গুণের মধ্যে আরোও অসাধারণ গুণ হচ্ছে, বাংলাভাষা ছাড়াও ইংরেজি, উর্দু, ফার্সি ও হিন্দী ভাষায় তাঁর প্রচুর দখল। বিভিন্ন ভাষার সাহিত্য থেকে সাহিত্যরস তাঁকে করে তুলেছে মহৎ থেকে মহিয়ান। সাধনা থেকে সাধক। জ্ঞান থেকে জ্ঞানী আর সাধারণ থেকে অসাধারণ।

রেজাউল করিম রেজা
(লেখাটি চলবে, চোখ রাখুন)

সর্বশেষ সংবাদ

দেশ এর আরও সংবাদ